"বনে নয়, মনে মোর পাখি আজ গান গায়..." বনে এসে, পাখির ডাক শুনেও, এ গানটা দিব্যি গাইছে সুকমল!
কাল শেষ রাতের ট্রেনে উঠে আজ ভোরে এসে পৌঁছে গেছি এই বন-পাহাড়ের টিলা ডুংরির দেশে চার বনবিহারী।
আমাদের সবাই সিনিয়র সিটিজেনের দোরগোড়ায়। চাকরি ফুরিয়ে এসেছে। সেই কবে থেকে দলবেঁধে বনে-জঙ্গলে, পাহাড়ে- সমুদ্রে ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছি। দল অনেকবার বদল হয়েছে। নতুন নতুন ভ্রমণ সাথী এসে জুটেছে। ভ্রমণ থেমে থাকে নি।
এজায়গাটা সীমান্তবর্তী এক জঙ্গুলে জনপদ। আদিবাসী মানুষজনদের ঘর- বাড়ি, চাষ জমিন। শান্ত, নির্জন জায়গাটায় এসে আমরা সবাই বেশ খুশি। দেখার মধ্যে আছে অনেকটা দূরে একটা ছোট নদী- নুনিয়া। একটু দূরে একটা ছোট্ট টিলা ও প্রাচীন শিব মন্দির। আর ছড়ানো সবুজ ঘন জঙ্গল। চরাচর জুড়ে ছবির মত নিসর্গ। থাকার জন্য এই একটাই সেকালের বনবাংলো।
বাংলোর চৌকিদার ভোলারাম বাস্কি। বুড়ো নেশায় টলোমলো থাকে সারাদিন। আমাদের রান্নার দায়িত্ব ভোলারামই সামলাচ্ছে। ওর ছেলে বনমালী আমাদের জন্য দোকান - বাজার সব করে এনে দিচ্ছে। ছেলেটা কলেজে পড়ে। কথাবার্তায় বেশ সপ্রতিভ। ভোলার ছেলে মনেই হয় না। এক প্রজন্মেই অনেকটা তফাত ঘটে গেছে!
চাঁদ উঠুক না উঠুক, আজ পূর্ণিমা! সুকমল গলা ছেড়ে গাইছে," ও চাঁদ, সামলে রাখো জোছনাকে, কারো নজর লাগতে পারে...." আমাদের সবার হাতে পানীয়। তৃতীয় রাউন্ড চলছে। গুণ গুণ করে আমরাও গলা মেলালাম," মেঘেদেরও উড়ো চিঠি উড়েও তো আসতে পারে..." রাত গভীর হয় নি তত। চাঁদ নেই আকাশে। মেঘ জমে আছে। আড়াল আবডাল থেকে তারারা কেউ কেউ উঁকি দিয়ে হাসছে।
ভোলা কাঠের আগুনে রান্না করছে। রাতে দেশী মুরগীর ঝোল আর ভাত। ভোলা রুটি বানাতে জানে না। তাই তপন বেজায় চটে গিয়ে গাল দিয়ে ফেলে," রুটি বানাতেও শেখো নি! তুমি চৌকিদার না জমাদার?" আমরা তপনকে থামাই। মুখ চেপে ধরি। ভোলার ছেলে বনমালী দূরে দাঁড়িয়ে সব দেখে। শোনে। কিন্তু কিছু বলে না। কেমন গম্ভীর ভাবে চেয়ে চেয়ে তপনকে মাপছিল!...
আজ ফিরে যাব। বিকেলে ট্রেন। দুপুরের খাওয়া সেরেই ভোলাকে বললাম, "বনমালী কে ডাকো। ওর বিলটা মিটিয়ে দিয়ে যাই।"
বনমালী বাইক চালিয়ে চলে এলো। গত দু'দিন ও আমাদের সব বাজার - হাট করে দিয়েছে। আমরা এসেই ওর হাতে কিছু টাকা দিয়ে বলেছিলাম, খরচ করো। হিসেব করে পরে নিয়ে নেবে।"
বনমালী একটা কাগজ এগিয়ে দিল। রজত চোখ বুলিয়ে সব দেখে নিচ্ছে। আমি আর সুকমল শেষ মুহূর্তের কিছু ছবি তুলে নিচ্ছি। তপন রজতের পাশে দাঁড়িয়ে বিলটা দেখছে।
" হ্যাঁরে, শুনে যা.." রজতের ডাক শুনে ওর কাছে এগিয়ে গেলাম। তপন ফিসফিস করে বলল," দেশী মুরগী আনতে দূরের কোন গ্রামে গিয়েছিল। তাই পেট্রলের দাম ধরেছে দেড়শো টাকা! আর ওর আনার মজুরী একশো টাকা! "
আমি, সুকমল চুপ করে শুনলাম। বনমালী একটু দূরে দাঁড়িয়ে। রজত বলল," তোরা সবাই পাঁচশো করে টাকা দে। ওর পেমেন্ট টা করে দিই।"
দুপুরে খেয়েই বেরিয়ে পড়তে হয়েছে। স্টেশনে যেতে সময় লাগবে। গাড়ির দুলুনিতে সবাই চোখবুজে ঝিমোচ্ছে। আমারও ঘুম ঘুম পাচ্ছে। তবু যেন ঘুমতে ইচ্ছে করছে না। বাইরের এই সবুজ প্রকৃতি, পাহাড়- টিলা- টাঁড়- ডুংরি কে চোখের সামনে থেকে হারিয়ে যেতে দিতে মন চাইছে না। তপন হঠাৎ বলল," ভাব, একটা মুরগী এনে দিয়ে পেট্রলের দাম দেড়শো টাকা নিয়ে নিল! মুরগী তো আমরাই হয়ে গেলাম!"...
সেই কবে হলুদপুকুরে গিয়েছিলাম বন্ধুরা দলবেঁধে। পঁচিশ বছর আগে তো বটেই! সেবার আমার সাথে ছিল উৎপল, সুশান্ত ও প্রশান্ত। বাংলোর চৌকিদার খেলারাম আমাদের জন্য দেশী মুরগী গ্রাম ঘুরে ঘুরে খুঁজে ওর লজঝরে সাইকেলের হাতলে ঝুলিয়ে নিয়ে এসেছিল। কি সস্তা ছিল সেই দেশী তাগরাই মোরগা টা। খেলারাম মোরগার দামটাই শুধু নিয়েছিল। বাড়তি একপয়সাও নেয় নি। ওরা তো বোকা ছিল! আর আমরাও তখন মনে করি নি, কিছু টাকা তো ওর পারিশ্রমিক হিসাবে দেওয়া উচিৎ। ও চায় নি, আমরাও দিই নি!..
বনমালীরা কেন বোকা হয়ে থাকবে? আজ দেশী মোরগ কিনতে বাইক ছুটিয়ে যেতে হয় গ্রামের ঘরে ঘরে। বাইক তো আর জলে চলে না!...
আমি গাড়ির মধ্যে বসে বাইরের সব দৃশ্যপট দেখছি, আর আপন খেয়ালে এসব ভাবতে ভাবতে চলেছি। ভ্রমণ তো অনেক হল জীবনে! জীবনটাকে এবার একটু দেখি। দেখার চেষ্টা অন্তত করি!...
।। সমাপ্ত।।

0 Comments