জয়নারায়ণ সরকার
মোবাইলটা নেড়েচেড়ে রেখে দেয় শ্রেয়া। এখন আর বেশিক্ষণ ফোনে চোখ রাখতে ভাল লাগে না। যত দিন যাচ্ছে কিছুক্ষণ দেখার পর চোখে ঝাপসা লাগে। প্রথম প্রথম ভেবেছিল পাওয়ারের সমস্যা। ডাক্তারের কাছেও গিয়েছিল। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ডাক্তারবাবু বলেছিলেন, আপনার চোখে কোনও সমস্যা নেই। ব্যাজার মুখে বেরিয়ে এসেছিল চেম্বার থেকে। তাহলে আজকাল কেন মোবাইলে একটুক্ষণ চোখ রাখতেই ঝাপসা লাগে!
একটা সময় ছিল যখন ঘন্টার পর ঘন্টা অবলীলায় মোবাইল নিয়ে সময় কাটিয়ে দিত শ্রেয়া। এক মুহূর্ত মোবাইল ছাড়া থাকতে পারত না। সেই দিনগুলো এত তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যাবে স্বপ্নেও ভাবেনি কখনও।
দিলীপের সঙ্গে তো প্রথম পরিচয় সোশ্যাল মিডিয়ায়। পরিচয়ের মুহূর্তেই অজানা, অচেনা মানুষটিকে মন দিয়ে ফেলেছিল। রোজ রোজ কত কথা হত। গভীর রাতেও ফোনটা ভাইব্রেট করত। ঘুম জড়ানো গলায় কথা শুরু হলেও কখন যে দু-চোখ থেকে ঘুম উধাও হয়ে যেত তা কখনও টের পায়নি সে। বাকি রাতটা জেগে জেগে মনের মধ্যে স্বপ্নের জাল বুনতো শ্রেয়া।
বাড়ির কেউ বুঝতে না পারলেও মায়ের কাছে ধরা পড়েছে অনেকবার। মা বলতেন, অত রাতে কার সাথে কথা বলিস? ঠিকমতো ঘুম হয় না বলে বেলা করে বিছানা ছাড়িস। মেয়েদের বেলা অবধি ঘুমোতে নেই, তাতে অকল্যান হয় সংসারে।
মায়ের কোনও কথাই কানে ঢুকতো না। বিছানা ছেড়ে উঠেই আবার ফোন নিয়ে নাড়াচাড়া শুরু হয়ে যেত।
দিনের পর দিন মোবাইলে কথা বলার মাত্রাও বেড়ে গিয়েছিল। আশেপাশের লোকজন না দেখেই নিচু স্বরে অনর্গল কথা বলে যেত। রাতে মায়ের সাথে এক বিছানায় ঘুমোলেও, কিছুই টের পেত না মা। শোওয়ার সাথে সাথে গভীর ঘুমে ঢলে পড়তেন মা। আর শ্রেয়া চোখ দুটো বড় বড় করে মোবাইলের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকত। ভেতরে ভেতরে একটা উত্তেজনা টের পেত সে। তারপর ফোনটা ভাইব্রেট হতেই এক ঝটকায় কানে চেপে ধরতো। কত কত রাত এমনভাবে কেটেছে তার ইয়ত্তা নেই।
এক রাতে মা শুয়ে এদিক-ওদিক নড়াচড়া করতে থাকে। কিছুক্ষণ পরে টের পায় শ্রেয়া। মা চোখদুটো বড় বড় করে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। হঠাৎ বলে, শোন শ্রেয়া, তোর এই ফোনের ব্যাপারটা নিয়ে বাবা খুব চিন্তিত। ওসব নিয়ে আমাকে দু-এক কথা শুনিয়েছে। আমি কি তোর জন্য একটু শান্তিতে থাকতে পারব না!
শ্রেয়া পাশ ফিরে একটা হাত দিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে বলে, কেন, আমি আবার কি করলাম? তাছাড়া বাবা তোমাকে কেন বলছে, যা বলার আমাকে বলতে পারত।
মা একটা জোরে শ্বাস নিয়ে বলে, কোনওদিন তোর বাবা তোকে কিছু বলেছে! আমাকেই তো সবকিছুর জন্য দায়ী করতে অভ্যস্ত। কত কথা আর শুনবো আমি!
শ্রেয়া আর কোনও কথা বলে না। মাকে জড়িয়ে ধরে চুপ করে শুয়ে থাকে।
ওদিকে বালিশের পাশে রাখা ফোনটা ভাইব্রেট হতে থাকে। আজ আর ধরতে ইচ্ছে করছে না। একবার কেটে গেলেও তারপর ঘন ঘন ভাইব্রেট হতে থাকে। এদিকে মা তখন গভীর ঘুমে। ঘনঘন ফোনের গোঁ গোঁ আওয়াজ কানের মধ্যে ঝড় তোলায় নিজেকে ঠিক রাখতে পারে না। ফোনটা কানে চেপে ধরতেই ওপারে দিলীপের গলা পায়। দিলীপ বলে, কতবার ফোন করছি, এখন ধরার সময় হল?
শ্রেয়া নিচু স্বরে বলে, বড্ড ক্লান্ত। ঘুমিয়েও পড়েছিলাম। আজ আর কথা বলতে পারব না।
বলে ফোনটা কেটে দেয়। বাঁ-পাশ ফিরে শোয়। ওদিকে ফোনটা ভাইব্রেট হয়েই চলেছে।
মাকে অনেকদিন বাদে এভাবে কথা বলতে শুনলো শ্রেয়া। বাবাও মোবাইলে কথা বলা অপছন্দ করছেন? প্রশ্নটা মনের মধ্যে উঁকি দেওয়ায় কেমন অস্বস্তিবোধ হতে থাকে তার।
পরদিন সকালে ফোন বাজতেই দ্যাখে দিলীপ করেছে। সে ফোনটা হাতে নিয়ে ছাদে গিয়ে দাঁড়ায়। তারপর ফোনটা কানে ধরে নিচু স্বরে বলে, হ্যালো...
ওপার থেকে দিলীপ এক নিঃশ্বাসে বলতে থাকে, সারা রাত ঘুমোতে পারিনি। তাই সকাল-সকাল ফোন করলাম। কি এমন হল যে রাতে কথা বলতে পারলে না!
শ্রেয়া এবার ভারী গলায় বলে, সে অনেক কথা।
দিলীপ বলে, কী কথা, সেটাই তো শুনতে চাইছি।
শ্রেয়ার গলা আরও কঠিন হয়ে ওঠে। বলে, আমি তোমার সাথে দেখা করতে চাই। রোজ রোজ ফোনে কথা বলা আমার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
দিলীপ খানিকটা থমকে যায়। তারপর বলে, দেখা তো একদিন না একদিন হবেই। কিন্তু রাতে তোমার কণ্ঠস্বর না শুনলে আমার যে ঘুম আসে না।
আরও কঠিন গলায় শ্রেয়া বলে, কবে দেখা করবে বলো?
দিলীপ বলে, ঠিক আছে, কালকে দেখা হবে।
ফোনটা কেটে যায়। শ্রেয়া দু-তিনবার হ্যালো, হ্যালো করলেও কোনও সাড়া-শব্দ পায় না। মনে মনে ভাবে, দিলীপের ফোনের চার্জ হয়তো শেষ হয়ে গেছে। শ্রেয়া চুপচাপ ছাদ থেকে নেমে আসে।
কলেজ ছুটির দিনগুলো শ্রেয়া রান্নাঘরে মাকে সাহায্য করে। সেদিন কলেজ না থাকায় সে নিজে থেকেই নানা সবজি কেটে দিতে থাকে। মোবাইল ফোনটা মেঝেতে রেখে দেয়। ওভাবে রাখতে দেখে মা বলে, ফোনটা ওখানে রাখছিস কেন, তোর পড়ার টেবিলে রেখে আয়।
শ্রেয়া মাথা নেড়ে বলে, না, তা আর দরকার নেই। সবজি তো বেশি নেই, এক্ষুণি কাটা হয়ে যাবে।
মা আর কথা বলেন না। শ্রেয়া সবজি কাটতে কাটতে মাঝে মাঝেই ব্যাকুল হয়ে তাকায় ফোনটার দিকে। মা ওর অন্যমনস্কতা দেখে বলে, ঠিক করে কাটাকুটি কর, নইলে আঙুল কেটে যাবে! মায়ের কথা শুনে লজ্জা মাখানো গলায় শ্রেয়া বলে, এই তো হয়ে গেছে।
চটপট সবজি কেটে পড়ার টেবিলে গিয়ে বসে শ্রেয়া। ফোনটা নিতে ভুল করে না।
ইদানিং শ্রেয়াকে ফোনে খুব একটা কথা বলতে দেখা যায় না। তবুও সে ফোনটা কখনও হাতছাড়া করে না।
বেশ কয়েকদিন ধরে খেয়াল করেছে মা। ওদিকে বাবাও খুশি হয়েছেন মেয়ে ফোনে ব্যস্ত না থাকায়।
শ্রেয়া দিন দিন কেমন অস্থির হয়ে উঠতে থাকে। ওর চোখে-মুখে ধরা পড়ে রাত জাগা ক্লান্তি। মাঝে মাঝে সামান্য কারণে মেজাজ হারিয়ে ফেলে। তারপর কয়েক দিন পর থেকে ক্রমশ নিশ্চুপ হয়ে যেতে থাকে সে। মায়ের চোখ এড়ায় না। কলেজ ছুটি হলেও এখন আর রান্নাঘরে ঢোকে না শ্রেয়া। ঘরের মধ্যেই চুপ করে বসে থাকে আর একরাশ চিন্তা ওকে যেন ঘিরে রেখেছে। ওর সামনে এসে দাঁড়ায় মা। ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে মা বলে, কী হয়েছে শ্রেয়া? আমাকে বল, দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে।
শ্রেয়া নিজেকে আর ধরে রাখতে পারে না। মাকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কাঁদতে থাকে। ওর পিঠে, মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে মা বলে, ভয় পেয়ে লাভ কী? পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হবে। পালিয়ে বাঁচা যায় না।
শ্রেয়া এক হাত দিয়ে মোবাইলটা দিতে ইশারা করে। মা বিছানা থেকে তুলে ওর হাতে দেয়। শ্রেয়া এবার কাঁপা কাঁপা হাতে দিলীপকে ফোন করে। ফোনটা কানে ধরে স্থবির হয়ে বসে থাকে সে। হঠাৎ গুমরে কেঁদে ওঠে শ্রেয়া। তড়িঘড়ি মা ওর কাছ থেকে নিয়ে ফোনটা কেড়ে নিয়ে কানে দিতেই শোনে, এই নাম্বারের কোনও অস্তিত্ব নেই।

0 Comments