Biswanath pal




প্রাণ ভরে শুনুন -বাংলা গান   -  বিশ্বনাথ পাল

 
লোকে বলে যে সংগীত ভালবাসে না সে মানুষ খোন করতে পারে। আজ বিশ্বসংগীত দিবস।সংগীত আমাদের জীবনে মরণে নিত্য প্রয়োজনীয় ।শোক বা সুখের বাজারে সংগীতের কদর সাদরে।সংগীতের মধ্যে যে আছে যে দোলা,সেই দোলাতেই আমরা ভুলেছি কান্না ।মনে পড়ে মাটির ঘরে ঠাকুমা রখন ছেলে ঘুমালো পাড়া জুড়াল বলে আপন সুরে আপন স্বরে ঘুম পাড়াতেন।পিঠে তালে তালে হাত ছাড়ালে চোখের পাতায় ঘুমের সমুদ্র নামত।আপনি বলবেন: এ মা এই লোকটা জানে না।এতো ছেলে ভুলোনোর ছড়া।
গান কেন হতে যাবে ? ঠিক গান ,কবিতা আর ছড়া আমাদের মনের রাজ্যে পাশাপাশি অবস্থান করার জন্যে সুরের আগুন লাগলে সব ঘরই পুড়ে যায় । তাদের আলাদা অস্তিত্ব তারা গর্বের সঙ্গে ভুলতে বসে। মানুষের অন্তকরণে আনন্দের আবেশ তৈরিতেই যে তাদের স্বার্থকতা।
সঞ্চারী ,আভোগ বা মুখতার মধ্যে মুখিয়ে আমরা এই আলোচনাকে রসহীন করতে চাই না।
তবে দক্ষ এনাটমিক যেমন আমাদের প্রাণ নামক বস্তুটির সঠিক অবস্থান কোথায় তা বলতে পারেন না।প্রাণের উপস্থিতিটুকু বলতে পারেন।আরো আশ্চর্যের বিষয় প্রাণের অস্তিত্ব বজায় থাকলে আমাদের অঙ্গে প্রত্যঙ্গে তার অনুরণন চলতে থাকে।আমাদের হৃদয় বলে ঠিক ঠিক?আমাদের ধমনীর বলে দিক দিক,
কান টানলে মাথা যায়,খিদে পেলে খাবার চাই।
ফিক সেই রকম একটা সার্থক গানের প্রাণটি যে ঠিক কোথায় নেড়া বাঁধে তা জানতে গিয়ে আমরা ভ্যাবাচাকা খাই।কেউ বলেন কথাটাই আসল।কেউ বলে সুরে পাগল।কেউ বলে তাল।যা আজকের গানে পাওয়া যায় না।
কথা আবার শুধু কথা নয়।কথার পিঠে কথা চড়ালেই তা হবে না। কথার সুনির্দিষ্ট অর্থ যেমন থাকবে তেমনি থাকবে তার ছন্দও।ছন্দের তালে তালে সুর যেন ময়ূরী হয়ে পেখম মেলে। আদর্শ গানের সঙ্গে ছন্দ,সুর আর লয়কে বিচ্ছিন্ন করতে গেলে গানের প্রাণ বেরিয়ে যায় ।নিষ্প্রাণ গান আর মেশিন গান দুটোই তখন আমাদের হৃদয় তন্ত্রীতে আবর্জনার স্তূপ হিসাবে থেকে যায় ।
গান কে শুধু শোনার জিনিস বললে ভয়ঙ্কর ভুল হবে।গান বোধের জিনিস ।গানই তো জ্ঞান ।
হৃদয় দিয়ে বোঝার জিনিস।ভাললাগার মন দিয়ে চেটেপুটে খাওয়ার জিনিস।স্মৃতির সরণিতে মণি মুক্তা র মতো রেখে দেওয়ার বিষয় সংগীত।
সংগীত আমাদের আনন্দের অচ্ছেদ্য বন্ন্ধন আবার সুখের সায়রে ফুরফুরে বাতাস যেমন আবার দুঃখের ক্ষণে নির্জনে হা -হুতাশ।
করোনাকিলেও:দেখছি অনেক রোগীকে মিউজিক থেরাপী দিতে।অর্থাৎ সংগীত এই অর্থে ওষুধও ।আবার সংগীত হচ্ছে সাধনার ক্ষেত্রে আত্মা ও পরমাত্মার মিলনের সহজতম,সরলতম এবং
সুন্দর তম মাধ্যম।এজন্য সংগীতকে পরা অর্থাৎ শ্রেষ্ঠ বিদ্যা হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।জ্ঞানদাত্রী মা সরস্বতীর হাতে তাই বীণা দেখি।মহাদেবের হাতেও বীণা, পঞ্চমুখে পঞ্চানন রুদ্রসংগীত গান।
জগতের সব ধর্মমতের শ্রেষ্ঠ সাধকেরা একাধারে সংগীত রচয়িতা,সুরকার এবং গায়ক।
সাধকরামপ্রসাদ,কমলাকান্ত,লালন
ফকির,শ্রীরামকৃষ্ণ,প্রেমিক,স্বামী বিবেকানন্দ,ভবাপাগলা প্রমুখের নাম এ প্রসঙ্গে উল্লেখ যোগ্য।আবার স্বল্প আয়ূর কবি রজনীকান্ত সেন,বা অতুল প্রসাদের গানের আবেদন অসাধারণ ।
ভারতে গানের ইতিহাস সমৃদ্ধ হয়েছে বেদে। চতুর্বেদ এর সামবেদ সংগীত হিসাবেই সমধিক পরিচিত।বেদে হেন জিনিস নেই বলা যাবে না।এই জন্য বেদকে জ্ঞানবেদও বলে ।
বাংলা গানের ক্ষেত্রটি যা বুদ্ধ সহজিয়া ভাবের চর্যাপদ বা চর্যাগীতি পদ হতে।বৈষ্ণব পদাবলির অন্দরে মহাজনদের ভক্তির আখরে পূর্ণ পেয়েছে।তাই তো কানু বিনে গান নেই আজো শুনতে হয় যেমন তেমনি শুনতে হয় ধান ভানতে শিবের গীত ।
কবীরের দোঁহা,ভগবান বুদ্ধের যুগে গানের সঙ্গে নৃত্য যোগ হয়েছে। হরিকথাকে,হরিগুণগানকে
অর্থাৎ কীর্তনকেও সম্বল করে ভক্তি ভাবের বান এনেছিলেন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু।"শান্তিপুর ডুবু ঢুবু নদে ভেসে যায় ।" কৃষ্ণ কথার প্লাবনে ভেসে গেল ছত্রিশ জাত।
নানকের মধ্যেও ছিল সংগীত প্রীতি। স্বর্ণ মন্দিরের সুরেলা ভক্তি গীতি কোন অংশে কম নয়।মুসলিম সমাজেও ময়নামতীর গান।আলাউলের প্রতিভা চমক জাগালো সাহিত্য সংস্কৃতির ঘোর দুর্দিনে।
ভারতীয় সংগীতে ব্রাহ্ম সংগীতের প্রচলন ঘটল।নিরাকারবাদের এই সময়ে অসীমের সন্ধানে সংগীত পল্লবিত হয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ ভান করে ভানুসিংহের
পদাবলী লিখেছিলেন অল্প বয়সের চপলতার কারণে।তিনিই বড় মুখ করে লিখেছিলেন"মরণে রে তুঁহু মম শ্যাম সমান।"
দীর্ঘ একাশি বছরের আয়ূষ্কালে ৪৭জন প্রিয়জনের মৃত্যুর শোক হজম করে সব মানুষের সুখে দুঃখে বিপদে সম্পদে দাঁড়িয়ে বিকল্প এই কবি গানের ভুবন কে
প্রতিভার জোরালো শক্তি দিয়ে
বিনির্মাণ করেছেন।যে হেতু গানের বাণী ও সুরের নির্মাতা তিনিই তাই তাঁর প্রতিটি গানেই কথা আর সুরের মণিকাঞ্চন যোগ লক্ষ্য করা যায় ।রবীন্দ্র সংগীত বাঙালীর লক্ষ্মীর ঝুলিতে অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পদ।আমাদের মনের কোনে যখন যে ভাব ফুটে ওঠে বিশ্বকবির গানের ভুবনে তার সজীব নমুনা দেখতে পাই।সঙ্কোচের বিহ্বলতা,তোমার অসীমে,আমরা সবাইরাজা,আছে দুঃখ,আছে মৃত্যু, এ দিন আজি কোন ঘরে গো,
আকাশ ভরা সূর্য তারা বিশ্বভরা প্রাণ,আমি ভুয় করব না,ও আমার দেশের মাটি,তুমি ডাক দিয়েছ কোন সকালে,বিপদে মোরে রক্ষা করো,তোমার পূজার ছলে তোমায় - -- - -রত্ন ভাণ্ডারের এক একটি রত্ন।
এরপর বাংলা গানের জগতে নজরুলগীতিকে উল্লেখ করতেই হয়।গভীরতার দিক থেকে তা রবীন্দ্রনাথের খুব কাছের বলা না গেলেও মাটিলসুরের ছোঁয়া এবং সহজিয়া এই গুণের জন্য নজরুল গীতি আমাদের সহজেই কানকে আকর্ষণ করে।এমন কোন বাংলা বেতার কেন্দ্র নেই যেখানে রবীন্দ্র সংগীত আর নজরুলগীতি না বাজানো হয়।
গানের বিভিন্ন ধরনের কথায় এবার আসি।আউল,বাউল ,দরবেশ,হাসির গান ,নাটকের গান ,ভক্তিমূলক গান,ভাটিয়ালি গান,ঝুমুর,আলকাপ,ভাদু,টুসু,ঘেঁটুগানের পাশাপাশি,কবিগান, সাঁকিগান,বৃন্দগান,দেশের গান,মাটিরগান,ছায়াছবির গান,প্যারোডিগান,জীবনমুখী গান,ব্যাণ্ডের গান -- - -কত না গানের শ্রেণি।লোকগীতির একটি ধারা জমেছে বেশ। দ্বিজেন্দ্রলাল,
সুকুমার রায়, সত্যজিৎ রায়,
গৌরীপ্রসন্ন, পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়,কবীর সুমন, নচিকেতা,জিৎ গাঙ্গুলী প্রমুখ কথার জাদুতে
লতা আশা সন্ধ্যা পঙ্কজমল্লিক , হেমন্ত সুচিত্রা কনিকা মান্না সতীনাথ মানবেন্দ্র তরুণ কিশোর পান্নালাল, ভীমসেনযোশী জ্ঞান প্রকাশ ঘোষ, বেগম আকতার, ফিরোজা বেগম,ধীরেন বসো,বিমান মুখোপাধ্যায়,অজয়চক্রবর্তী কুমারশানু পূর্ণদাস বাউল,গোষ্ঠগোপাল দাস, অরিজিৎ সিং,শ্রেয়া ঘোষাল, ওপার বাংলার রুণা লায়লা ,সাবিনা ইয়াসমিন,রাধারাণী, ছবি বন্দ্যোপাধ্যায়,সুমন ভট্টাচার্য, শান্তা দাস প্রমুখ অজস্র গুণীশিল্পীর সুরেলা জাদুতে বাংলা গানের ইন্দ্রধনু শুধু রাঙিন নয়, প্রাণময় এবং গীতিময়।বাংলার মাটি বাংলার জল শুধু নয়, বাংলার প্রাণই হল বাংলা গান।তাই মন ভাল রাখার জন্য --মানসিক সুস্থতার জন্য ভালো সংগীত শুনুন প্রাণ ভরে ।

Post a Comment

0 Comments