#মা_নিষাদ (শেষ পর্ব )
#সুব্রত_মজুমদার
সেদিন রেলষ্টেশনে যে ভিখারীটি মারা যায় সে আর যাই হোক কোনও কেলেঙ্কারিতে যুক্ত নয়। তাহলে এই হত্যা কেন ?
কারন সেই রেল স্টেশনে নেমেছিলেন আরেকজন ব্যক্তি। যার মুখোমুখি হয়ে যায় নিষাদ। আচমকা নিষাদকে দেখে চমকে যায় সে । নিষাদও চিনতে পারে লোকটাকে। সঙ্গে সঙ্গে ছোড়ে তীর। কিন্তু কপালের দোষে সেটা গিয়ে লাগে একজন নিরীহ ভিখারীর দেহে। নিষাদ তখন ভয় পেয়ে তড়িঘড়ি পালিয়ে যায়। আর পালানোর সময় একটা জিনিস ফেলে যায় অকুস্থলে। সেটা এই লাল ডায়েরি। যেটাতে রয়েছে অপরাধীদের লিস্ট।
সে রাতে রেলষ্টেশনের লোকটাই একমাত্র সাক্ষী যিনি নিষাদকে স্বচক্ষে দেখেছেন। আর তিনি আমাদের এখানে হাজিরও আছেন।"
বিক্রমের কথা শুনে উপস্থিত লোকেরা একে অপরের দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকাতে লাগল। সবার এরকম কৌতুহল দেখে বিক্রম বলল,"কি ইন্সপেক্টর বর্মা ঠিক ঠিক বলছি তো ?"
ইন্সপেক্টর বর্মা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলেন। মুখে কথা সরল না। ব্যাপার দেখে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী উত্তেজিত হয়ে বললেন, "কি হল ইন্সপেক্টর, কথা বলছেন না কেন ?"
হাত তুলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নিবৃত্ত করে বিক্রম বলল, "আমি বলছি। ইন্সপেক্টর বর্মা ছিলেন সেই রাত্রে। একটা ইনভেস্টিগেশনের কাজে স্টেশনত্ত্বরে গিয়েছিলেন সে রাত্রে। আর লাল ডায়েরিটা সেদিন নিষাদের কাছ হতে উদ্ধার হয়নি, ওটা ছিল ইন্সপেক্টরের কাছেই। নিউ আমব্রেলার স্ক্যামের হিসাব রয়েছে ওই ডায়েরিতে। সঙ্গে জড়িত লোকেদের তালিকা। ডায়েরিটা আমার হাতে দেওয়ার আগে নিজের নামটা সযতনে কেটে দিয়েছিলেন। কিন্তু সত্য কখনও লুকানো যায় না ইন্সপেক্টর। "
-"তাহলে নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য যে লিস্ট দিয়েছিলেন..... "
-"তারা সবাই স্ক্যামে জড়িত লোক। ডায়েরিতে এদের নাম আছে।" এডিজির কথার উত্তরে বলল বিক্রম।
রোষকষায়িত চোখে ইন্সপেক্টর বর্মার দিকে তাকালেন এডিজি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন,"আপনি বলুন বিক্রমবাবু... "
সামনের পোডিয়ামের উপর হতে জলের বোতলটা তুলে নিয়ে গলা ভিজিয়ে নিল বিক্রম। বোতলটা স্বস্থানে নামিয়ে রেখে আবার শুরু করল।
"ইন্সপেক্টর বর্মার মুখোমুখি হতেই তীর ধনুক বের করে নিষাদ। ইন্সপেক্টর কিছু বুঝে ওঠার আগেই তীর চালিয়ে দেয়। কিন্তু ভাগ্যক্রমে সেটা গিয়ে লাগে ভিখারীটার বুকে। প্রাণভয়ে পালিয়ে বাঁচেন ইন্সপেক্টর। আর সেই সূযোগেই পোষাক পরিবর্তন করে নেয় নিষাদ। হাজির হয় নতুন চরিত্র, চাদরওয়ালা রহমত সেখ।"
বিক্রমের মুখে নিজের নাম শুনেই কাঁদতে শুরু করেন রহমত,"অমন বলবেন না স্যার, উপরবালা আছে, সহ্য হবে না। গরীবের নামে দোষ দিয়ে বড় মানুষদের ক'দিন বাঁচাবেন স্যার ?"
দৃঢ় কণ্ঠে বিক্রম বলল,"সে ভাবনা আমার। অসত্যের বেসাতি আমি করি না। থানায় গিয়ে অনেক অসংলগ্ন কথা বলেছিলেন। নিষাদের যে বর্ণনা দিয়েছিলেন তাও অসত্য। আসলে নিষাদ আপনিই।"
-"আপনি আবার ভুল করছেন স্যার। " বলল রহমত।
বিক্রম হেসে বলল,"না। আমি ঠিকই বলছি। আপনিই ছ'মাস আগে জেল হতে মুক্তিপাওয়া অলকেশ বোস। হ্যাঁ সেই অলকেশ বোস যিনি কুখ্যাত 'নিউ আমব্রেলা রিসার্চ ইনস্টিটিউট লিমিটেড' এর কয়েক হাজার কোটি টাকা স্ক্যামের অন্যতম নায়ক।
কোম্পানির সংস্থাপক ডঃ স্টিফেনের সঙ্গে মিলে এই কাজ করেন আপনি । ডাঃ স্টিফেন তো পালিয়ে বাঁচেন, কিন্তু ধরা পড়ে যান আপনি । বিচারে মেয়াদি কারাদণ্ড হয়। আর ফিরেই মেতে ওঠেন পাপ করে হাত ধুয়ে ফেলা লোকগুলোকে নিকেশের কাজে।"
এবার উত্তেজিত হয়ে উঠল রহমত সেখ, চিৎকার করে বলল," হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমিই অলকেশ বোস। আমিই নিষাদ। আমার শর হতে বাঁচবে না এরা। পারবে না এই শয়তানদের বাঁচাতে। আইন কানুন প্রশাসন কার সাহায্য নেয় না এরা এদের মিথ্যার সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে ?
এরা গরীবের সেবা করতে করতে রাতারাতি কোটিপতি হয়ে যায়। এদের সাম্রাজ্য গড়তে গিয়ে কত যুবক পথভ্রষ্ট হয়, এদের লোভের আগুনে পুড়ে যায় আম জনতার বাড়ি, ধর্ষিত হয় মা বোনেরা। এরপরেও এরা সমাজের আইকন। এদের সবকিছুই স্পেশাল। জেলেও স্পেশাল ব্যবস্থা। কতদিন চলবে এই অনিয়ম ? আমি চললাম বিক্রম, পারলে আটকে দেখাও।"
সঙ্গে সঙ্গে জ্বলে উঠল স্মোকবম্ব। ধোঁয়ায় ঢেকে গেল গোটা হল। দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়ে গেল। ধোঁয়া কমতেই দেখা গেল নিষাদ নেই। চিৎকার করে উঠল বিক্রম,"ইন্সপেক্টর গাড়ি বার করুন, বেশিদূর পালাতে পারেনি ও।"
নিষাদকে পাওয়া গেল। সে অনেকটা নিষাদের ইচ্ছাতেই। ভারত-নেপাল বর্ডারে একটা পরিত্যক্ত বাড়ির ঠিকানা দিয়ে ফোন এল বিক্রমের কাছে।
-"সায়ককে নিয়ে যান। ওকে আর আমার প্রয়োজন নেই।"
সত্যিই প্রয়োজন নেই সায়ককে। মন্ত্রী শতদল মহাপাত্রকে হত্যার পরও সায়ককে আটকে রাখা হয়েছিল নিরাপত্তার কারনে। পাছে সাহেবের সূত্র ধরে পুলিশ পৌঁছে যায় নিষাদের কাছে। নেপাল বর্ডার পেরিয়েই তাই সায়কের খবর দিল বিক্রমকে।
ইন্সপেক্টর বর্মার নেতৃত্বে বিশাল পুলিশ বাহিনী পৌঁছে ঘিরে ধরল ঘরটাকে। নিষাদ না থাকলেও নিষাদের কয়েকজন অনুচর ছিল সেখানে। উদ্দেশ্য ইন্সপেক্টর বর্মাকে নিকেশ করা। খণ্ডযুদ্ধ হল খানিক। নিষাদের লোকেদের অধিকাংশই মরল পুলিশের গুলিতে। সায়ককে উদ্ধার করা হল, তবে আহত অবস্থায়। পায়ে গুলি লেগেছে ওর।
ফেরার পথে খিকখিক করে হাসতে লাগলেন অঘোরবাবু। বিক্রম জিজ্ঞাসা করতেই বললেন, "বগলার ভবিষ্যদ্বাণী ফলল তাহলে। নিষাদ পালিয়েছে, পায়ে গুলি লেগে সায়কটা পড়ে আছে হাঁটুভাঙ্গা দ হয়ে। হাজার হোক এই অঘোর বাঁড়ুজ্জের ভাই বলে কথা ।"
শান্ত গলায় বিক্রম বলল, "আর এরকম একজন এলেমদার লোকের ভাইয়ের বিয়ে হচ্ছে না। ভাবতেও কষ্ট হয় অঘোরবাবু।"
বিক্রমের দিকে কটমট করে তাকালেন অঘোরবাবু, তারপর সেই যে চুপ হলেন আর মুখ খুললেন না। ঘরে গিয়ে যথেষ্টই বেগ পেতে হবে বিক্রমকে।
----

0 Comments