সুচন্দ্রা বসু
২৬.০৬.২১
চলার পথে,ট্রেনে বা জ্যামে গাড়িতে বসে থাকার সময় শিশু থেকে বৃদ্ধ সব বয়সের ভিক্ষুকদের দেখা যায়। একটি ব্যাপার লক্ষ্য করেছি যে
ভিক্ষুকের কোলে ছোট বাচ্চাটি ঘুমিয়ে আছে। কী’’ বাংলাদেশ, আর কী’’ ব্যাংকক, আ’মেরিকা। সারা’বিশ্বেই নাকি ভিখারিদের এক অবস্থা।আমি নিজের মনে ভাবি ভিক্ষুকের কোলের বাচ্চাটি সবসময় ঘুমিয়ে থাকে কেন?
এর পিছনে রয়েছে যে এক বীভৎস করুণ কাহিনী তা ওই ট্রেনযাত্রীর মুখে শুনে বিস্মিত হই
আমি। ভিক্ষুকটিকে পয়সা দিতে গেলে উনি
আমাকে বাধা দিয়ে বললেন,
এখন থেকে কোলে শিশু নিয়ে থাকা কোনো ভিক্ষুককেই আর কখনো টাকা-পয়সা দেবেন না। খাবার, পানি দিতে পারেন, কিন্তু টাকা-পয়সা কখনোই নয়। আপনার এই অভ্যাসে হয়তো বেঁচে যাবে কোনো একটি শিশুর প্রাণ।
দিতে গিয়েও দিলাম না।হ্যাঁ আমিও খেয়াল করেছি রাস্তার পাশে ছোট শিশু কোলে নেয়া মহিলাটির ভাঁজ করা পায়ে নাকমুখ গুঁজে চুপচাপ ঘুমাচ্ছে শিশুটি। আর রাস্তা দিয়ে পথচারীরা তাদেরকে টাকা দিয়ে সাহায্য করছেন।
উনিও বললেন
এই চিত্র শুধুমাত্র আমাদের দেশের নয়। পৃথিবীর প্রায় সব দেশের কাহিনী একইরকম।রাস্তার মোড়ে মোড়ে থাকা প্রায় প্রতিটি ভিক্ষুককেই পরিচালনা করে সুসংগঠিত সন্ত্রাসী মাফিয়া বাহিনী।
এরাই মাফিয়া যারা ভিক্ষুকদেরকে নিজেদের জিম্মায় রাখে?
আমি স্তম্ভিত। মাফিয়ারা এতো নিষ্ঠুর!
এইটা ওদের ব্যবসা।প্রতিদিন সকালে নিজেদের দায়িত্বে রাস্তার মোড়ে মোড়ে এনে বসিয়ে দিয়ে যায়। আবার সন্ধ্যা হলে নিজেদের দায়িত্বেই তা
আখড়ায় ফিরিয়ে নেয়। এরপর ভিক্ষুকের সারাদিনের যা ‘আয়’ তার সবটুকুই চলে যায় ওই মাফিয়া গ্রুপের হাতে। ভিক্ষুকের কপালে জোটে শুধু এক বেলার খাবার।
ভিক্ষুকরা সারাদিন যা পায় ওটাতে ওদের অধিকার নেই?
না।
তবে কোলের বাচ্চাটি?
সেটাও ওই মহিলার নিজের নয়।
এরা এতো এতো শিশু পায় কোথা থেকে? কীভাবেই বা ওই মাফিয়া গ্রুপগুলোর হাতে আসছে বাচ্চাগুলো?
বাচ্ছারা অধিকাংশই চুরি করা শিশু অথবা টাকার অভাবে থাকা মাদকসেবী পরিবারের কাছ থেকে ভাড়া নেয়া।
রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরে একটি প্রভাবশালী চক্র বিভিন্ন জায়গা থেকে শিশুদের ধরে নিয়ে গিয়ে পঙ্গু বা অচল করে দেয়। তারপর তাদেরকে ভিক্ষাবৃত্তিতে ভাড়া দেয়।
এছাড়া অনেক শিশুকেই ধরে এনে কব্জি, পায়ের রগ, পুরুষাঙ্গ কেটে দিয়ে অথবা বুকে, ঘাড়ে, মাথায় আঘাত করে অচল বানিয়ে দেয়। তারপর তাকে দিয়ে চলে ভিক্ষার ব্যবসা। সারা বিশ্বেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ এড়িয়ে অথবা তাদের সঙ্গে যোগসাজশ রেখেই এসব ব্যবসা চলে।
চমকে উঠলাম ওনার কথা শুনে। যেন আমার সব
উত্তর খুঁজে পেলাম।
প্রতিদিন ভিক্ষা করতে আসার আগে কোলের ওই শিশুটিকে নেশাদ্রব্য খাইয়ে ঘুম পাড়ানো হয়। তারপর সারাদিন ধরে নির্বিঘ্নে ভিক্ষাবৃত্তি চলে। তাই হাজারো গাড়ির হর্ন এবং নানা রকম শব্দের মাঝে শিশুটি সারাদিন চুপচাপ ঘুমিয়ে কাটায়।
এভাবে দিনের পর দিন নেশাদ্রব্য খাওয়ানোর ফলে কিছুদিন পরেই ওই শিশুটি মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ে। তারপর ওই শিশুটির স্থান দখল করে নেয় অন্য শিশু।
আপনি এতো জানলেন কীভাবে?
আরও জানি এই মাফিয়াগোষ্ঠী কি সাংঘাতিক
নৃশংস।
একটি অ্যালুমিনিয়ামের পাত্রের ভেতর টানা ছয় মাস আট-নয় বছরের এক শিশুকে জড়সড় করে আটকে রাখে। সারাদিনে শুধু একবার সামান্য ভাত অথবা রুটি-পানি দেয় তাকে। এইভাবে দিনের পর দিন একটি পাত্রের ভিতর থাকতে থাকতে শিশুটি কঙ্কালসার হয়ে পড়ে। এরপর তাকে ভিক্ষাবৃত্তিতে ভাড়া দেয়।
তাই এদেরকে সামাজিকভাবে মোকাবেলা করতে
হবে।এটাই একমাত্র উপায়, কখনো টাকা পয়সা দিয়ে ভিখারিকে সাহায্য করা উচিৎ না।
৪৬৫ শব্দ সংখ্যা

0 Comments