Sutapa Banerjee





বিভাগ-গল্প
শিরোনাম-দংশন
কলমে-সুতপা ব‍্যানার্জী(রায়)

বোস বাড়ির গিন্নীমা চিতল মাছের মুইঠ‍্যা করবে বলে বাইরের কলতলায় মাছগুলো ধুতে এলেন। পাশের বাড়ির প্রতিমা হাঁক পাড়ে-"ও মাসিমা আজ দেখি রান্নার খুব আয়োজন। বলি আছেটা কী?" গিন্নীমা
স্বর্ণসুন্দরী এক গাল হেসে-" আরে নাতিটার তো কাল জামাই ষষ্ঠী গেছে, আজ দুপুর অব্দি ষষ্ঠী আছে, তাই নাতবৌয়ের জন্য ষষ্ঠীর উপোস রেখেছি। আজ কুহু মানে নাত বউয়ের পছন্দের সব রান্না হবে।" প্রতিমা স্বগোতোক্তি করে-"মরণ কত ঢঙ দেখব বুড়ির।" গতকাল কুহু-র বাপের বাড়ির লোকেরা ব‍্যস্ত ছিল তাই ওরাও আজ আসছে নিমন্ত্রিত হয়ে। রান্নাটা রান্নার বউ হরিমতিই করবে, বোস গিন্নী হাতে হাতে গুছিয়ে দেওয়া দেখিয়ে দেওয়া এটুকু করছেন। ঠাকুমার অর্দ্ধেক গোছানো হয়ে যেতে কুহু ঘুম থেকে উঠে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বলে-"ও ঠাম্মি কিছু করতে হবে?" বোস গিন্নী-"না রে, আজ ছুটি নিয়েছিস তো, তোর নামের পূজোটা দেব।
স্নান সেরে এই নতুন শাড়িটা পরে চল আমার সঙ্গে মন্দিরে।" সবার জলখাবার খাওয়া হয়ে যেতে বোস গিন্নী ঠাকুর ঘরে পূজোর উপকরণগুলো সাজাতে বসে। ফুলগুলো গুছোতে গুছোতে মা ঠাকরুণ পরিস্কার শুনতে পান বাঁধানো ফটো থেকে বউমা শেলির কন্ঠস্বর-"মা আপনি কুহুকে যে ভালোবাসা দিচ্ছেন তার এক ছটাক যদি আমি পেতাম তো বেঁচে যেতাম।" বোস গিন্নী-" তুমি তো ধৈর্য‍্যটা ধরলে না বাছা, ছেলের জন্ম দিয়েই প্রায় সংসারের বোঝা আমার কাঁধে দিয়ে কেটে পড়লে।" শেলি-"না হলে কী করতাম, আপনার খোঁটা শুনে শুনে তো আমার কান ঝালাপালা হয়ে গেছিল, বাঁচার কোন পথ-ই তো রাখেন নি।" বোস গিন্নী-"অমন করে বোল না বউমা, তখন আমার বয়স অল্প ছিল, রক্তের তেজ ছিল। যদি দু-কথা বলেও থাকি তো এমন করবে। আজকের দিনে দুঃখ কোর না, কুহুর অকল্যাণ হবে।" ঠাম্মির বকবকের মাঝখানে কুহু নতুন শাড়ি পরে ডাকতে এসে দেখে ওর মৃতা শাশুড়িমা শেলির ছবির দিকে তাকিয়ে ঠাম্মি বকবক করছে। কুহু এর আগেও ব‍্যাপারটা লক্ষ‍্য করেছে, শুনেছে উনি নাকি আত্মঘাতী হয়েছিলেন। ঠাম্মি কুহুকে গাল ধরে আদর করে বলল-" আমার নাতবউকে সবকিছু পরলেই খুব মানায়।" পেছন থেকে শেলির ফটো যেন বলে উঠল-
"মা আপনি আমায় কোনদিন ম‍্যাক্সি পরতেও দেন নি।" বোস গিন্নী বেরোবার জোগাড় করতেই বাড়ির বড়কর্তা মানে কুহুর দাদাশ্বশুর হাঁক পাড়লেন-"গিন্নী
এখন কোথায় যাও?" কুহু দাদাশ্বশুরকে প্রণাম করে বলল-" ঠাম্মি আমার জন্য ষষ্ঠী করছেন তাই পূজো দিতে।" দাদু এক গাল হেসে-"বৌমা ষষ্ঠী,তা ভাল তা ভাল, ঘুরে এসো।" নীচের বসার ঘরে বসেছিলেন কুহুর বিপত্নীক শ্বশুর, যাকে সবসময়েই একটা উদাসীনতা ঘিরে থাকে। ওদের গমন পথের দিকে একবার তাকালেন মাত্র, কোন প্রশ্ন করলেন না। বউমা গিয়ে ইস্তক ছেলের দিকে ভাল করে তাকাতে পারেন না বোস গিন্নী। কেমন অপরাধী লাগে নিজেকে। ছেলের দ্বিতীয় বিয়ে দেওয়ার বহু চেষ্টা করেছেন কিন্তু ছেলে নাতি কল্লোলের অজুহাত দিয়ে ও পথ আর মাড়ায় নি। তাই তো কল্লোল ওর প্রেম আর পছন্দের কথা জানাতে সব আগে রাজী হয়েছিল
প্রলয়, বলেছিল-"মা কল্লোলের বিয়েটা দিয়ে দিই, একটু আনন্দ, একটু খুশির হাওয়া আসুক বাড়িতে।
বোসবাবু আর বোস গিন্নীও এককথায় মেনে নিয়ে খুব ঘটা করেই নাতির বিয়ে দিয়েছেন। কুহু এসে ইস্তক ওকে বুঝতেই দেয় নি যে ও এ বাড়ির বউ। নিজের বাপের বাড়ির মতো স্বাধীনতাই ও ভোগ করে। বোস গিন্নী নিজেকে আমুল পালটে ফেলেছেন, দ্বিতীয়বার আর কোন ভুল করতে চান নি। এই বদল ছেলের চোখেও পড়েছে আর দীর্ঘশ্বাস ফেলেও মায়ের এই বদলে স্বস্তি পেয়েছে। কুহুর বাপের বাড়ির লোকজনেরা এ বেলা আসতে পারবে না, একেবারে রাতেই আসবে।

পূজো দিয়ে এসে দুপুরের খাওয়াদাওয়ার পর আবার হেঁসেলের বাকী কাজ সেরে নিচ্ছেন বোস গিন্নী। কুহুও মাঝে মাঝে খবর নিয়ে যাচ্ছে। কাজের ফাঁকেই আবার যেন শেলির গলা শুনলেন-"মা আমার জন্মদিন পালনের জন্য আপনার ছেলে বার্থ-ডে কেকের অর্ডার করায় আপনি কত অশান্তি করেছিলেন মনে আছে। আর আমার বাবা-মাকে তো এ বাড়িতেই আসতেই দিতেন না, কেন মা কেন?" আওয়াজগুলো যেন বোস গিন্নীর
গলায় দলা পাকিয়ে উঠছে। কুহু জল ভরতে রান্নাঘরে এসে দেখে ঠাম্মি দরদর করে ঘামছে। কুহু ধরে ধরে বোস গিন্নীকে শোওয়ার ঘরে এনে শুইয়ে দিয়ে বলে-
"তুমি আর একদম উঠবে না, বাকীটা আমি সামলে নেব।" কুহুর হাতটা ধরে বোস গিন্নী বলে ওঠেন-"কুহু আমি খুব খারাপ না রে।" কুহু থমকে দাঁড়িয়ে ঠাম্মির হাত ধরে সামলায়-" না তো, দেখ আগেকার কথা আমি বলতে পারব না। আমার মনে হয় তুমি যে দুর্ব‍্যবহার তোমার শাশুড়ির থেকে পেয়েছিলে সেটাই কল্লোলের মা-কে ফিরিয়ে দিয়েছিলে। কিন্তু উনি যে আত্মহত্যা করবে সেটা তুমি বোঝ নি। তাই ঐ ঘটনার পর তুমি তোমার অপরাধ বোধ থেকে ওনাকে দেখতে পাও, ওনার কথা শোন। তুমি যত যন্ত্রণা ওনাকে দিয়েছ তার কয়েকগুণ বেশী তুমি নিজে পেয়েছ ও পাচ্ছো। যা ঘটে গেছে তা ভুলে যাও, এসো আমরা সবাই একটা হাসিখুশির জীবন কাটাই।"
বোস গিন্নী কুহুর কাছে ভেঙে পড়ে বলেন-"আমি পারব কুহু?" কুহু ঠাম্মির মাথায় হাত রেখে বলল-
"নিশ্চয়ই পারবে।"

Post a Comment

0 Comments