দেনা ( অণুগল্প)




# অণুগল্প -- দেনা
# গল্পকার -- অভিষেক সাহা

" ও, তুই, ভেতরে আয়।" কলিং বেলের শব্দ শুনে দরজা খুলে অনিকে দেখে বলল তমোনাশ।
" কোথাও যাচ্ছিস, না কী এলি ।" সোফায় বসে বলল অনি।
তমোনাশদের ফ্ল্যাটটা বেশ বড়। থ্রি বিএইচকে। ড্রইং রুমটা খুব সুন্দর করে সাজানো। আর সবচেয়ে যেটা অনির খুব ভালো লাগে, ভেতরের রুমগুলোর সঙ্গে সেপারেশনটা এমন, এখানে বসে কেউ দু'ঘন্টা আড্ডা দিলেও, ভেতরে কেউ ডিস্টার্ব হবে না।
" কেন যাওয়া- আসার কথা বললি?" তমোনাশ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
" তোর ড্রেস দেখে। এই বিকেল বেলা এমন ধবধবে সাদা পায়জামা- পাঞ্জাবি পড়ে আছিস , তাই।" অনি ব্যাখ্যা দিল।
" আরে না, না। আমি তো এমনিতে এসব পড়ি না। বছর দুয়েক আগে মা পুজোয় গিফট করেছিল। পড়ে দেখছিলাম ঠিক আছে কিনা।" তমোনাশ উত্তর দিল।
আরো কিছু টুকটাক কথা হল, কিন্তু অনি যেটা বলতে এসেছে, সেটা কিছুতেই বলতে পারছে না।
তমোনাশ অনির কলেজের বন্ধু । মাঝে কিছু বছর যোগাযোগ ছিল না। মাস ছয়েক আগে হঠাৎ দেখা। সেই থেকেই আবার চলছে। দু'মাস আগে তমোনাশ একদিন অনির কাছে হাজার দশেক টাকা ধার চায়। কারণ বলেনি। তবে বলেছিল দিন দশেকের মধ্যে দিয়ে দেবে। সেই দশ দিন পেরিয়ে বিশ, তিরিশ, চল্লিশ হয়ে আজ ষাট দিন। যখনই অনি টাকা চাইতে আসে তমো কোনোদিন না করেনি, আবার টাকাও দেয়নি।আজ তাই অনি ঠিক করে এসেছে টাকা না নিয়ে যাবে না, কিন্তু কথাটা কী করে তুলবে সেটাই বুঝতে পারছে না, শতহোক কলেজের বন্ধু তো !
" অনি, এই নে তোর দশ হাজার টাকা। একটু দেরি হয়ে গেল রে । আমার কতগুলো পেমেন্ট আটকে গেছিল ,তাই দেরি হল। আমি কারো কাছে দেনা রাখতে চাইনা !" টাকা ভরা সাদা খাম অনির দিকে এগিয়ে দিয়ে তমোনাশ বলল।
এতো মেঘ না চাইতেই জল! মনে মনে খুশি হল অনি , কিন্তু মুখে প্রকাশ করল না, শুধু বলল ," অসুবিধা তো হতেই পারে !"
" যা না ভেতরের ঘরে! বাবা- মা আছেন। ওরা দুজনই তোর কথা বলছিল। মাসি- মেসোও এসেছেন। ওদের সঙ্গে একটু গল্প কর , আমি টুক করে একটা কাজ সেরে আসছি।"
তমোনাশ বেরিয়ে গেল। অনি ভেতরের ঘরের দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকল।
অনির মনে হল যেন বিনা মেঘে বজ্রপাতের আওয়াজ ওর কানে এল। পায়ের নিচে কম্পন অনুভব করল। আরো কী কী হল ঠিক বুঝতে পারল না। তবে নাকে একটা তীব্র গন্ধ এসে লাগল। ধূপকাঠি আর রজনীগন্ধা মিশ্রিত শোকের গন্ধ। ঘরে ঢুকে অনি দেখল একদিকে খাটের উপর বসে আছেন তমোর বাবা- মা, আর উল্টো দিকের সোফায় ওর মাসি- মেসো, আর ওদের মাঝের টেবিলের উপর তমোনাশের ছবি। মোটা রজনীগন্ধার মালা দেওয়া। সামনে জ্বলন্ত ধূপকাঠি।

Post a Comment

0 Comments